Twitter

Follow palashbiswaskl on Twitter

Monday, August 24, 2015

ইকবাল, ঠাকুর এবং তারানায়ে মিল্লি হামিদ মীর

ইকবাল, ঠাকুর এবং তারানায়ে মিল্লি
হামিদ মীর

২৪ আগস্ট ২০১৫,সোমবার, ১৮:২৭



ঢাকা থেকে আগত একটি পত্র মনোমুগ্ধকর বিমূঢ়তায় আবিষ্ট করে ফেলেছে। ডাকে আসা বেশ
মোটাতাজা খামের বাইরে পত্র প্রেরকের নাম-ঠিকানা লেখা ছিল। খাম খুলতেই ভেতর থেকে
একটি বই এবং ইংরেজিতে লেখা এক 'মোহব্বতনামা' (ভালোবাসাপত্র) বেরিয়ে এলো। ঢাকা
থেকে আর ডি কুরায়শী পত্রটি পাঠিয়েছেন, যিনি বেশ বড়মাপের একজন ইকবালভক্ত। তিনি
লিখেছেন, ৪ জুন, ২০১৫ দৈনিক জঙ্গ পত্রিকায় আপনার কলাম 'আল্লামা ইকবাল আওর
তারানায়ে হিন্দি' প্রকাশিত হয়। ইমতিয়াজ বিন মাহতাব ওই কলাম উর্দু থেকে বাংলা ভাষায়
অনুবাদ করেন এবং নয়া দিগন্ত বাংলা পত্রিকায় তা (২ জুলাই, ২০১৫ 'আল্লামা ইকবাল ও
তারানায়ে হিন্দি' শিরোনামে) প্রকাশ করেন। আর ডি কুরায়শী (নয়া দিগন্ত) বাংলা পত্রিকায়
ওই কলাম পড়ার পর আমার ঠিকানা খোঁজা শুরু করেন। তার বয়স ৮৮ বছর। তিনি আমাকে
ধন্যবাদ জানানোর জন্য কিছু তোহফা পাঠাতে চাচ্ছিলেন। তোহফা হিসেবে তিনি আল্লামা
ইকবালের এক দুর্লভ গ্রন্থ Islam And Ahmadism (ইসলাম ও কাদিয়ানি মতবাদ)-এর
একটি ফটোকপি পত্রের সাথে পাঠান। গ্রন্থটি মূলত প্রাচ্যের কবি আল্লামা ইকবালের ওই সব
ইংরেজি প্রবন্ধের সঙ্কলন, যা তিনি জওয়াহেরলাল নেহরুর জবাবে লিখেছিলেন। নেহরু
১৯৩৭ সালে আহমদিয়া (কাদিয়ানি) আন্দোলনের ওপর কিছু প্রবন্ধ লিখেছিলেন, যা
কলকাতার মডার্ন রিভিউ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। আল্লামা ইকবাল নেহরুর জবাবে
বিস্তারিত প্রবন্ধ লেখেন, যা পরবর্তী সময়ে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। আল্লামা ইকবাল ও
নেহরুর মাঝে হওয়া এই জ্ঞানগর্ভ আলোচনা আজো বেশ গুরুত্ব বহন করে। আর এ জন্যই
আর ডি কুরায়শী গ্রন্থটি পাঠিয়েছেন। তার ভালোবাসার জন্য অনেক অনেক শুকরিয়া জানাই।
ইমেইল এবং এসএমএসের এ যুগে বেশ অর্থ ব্যয় করে বাংলাদেশ থেকে পত্রের সাথে বই
পাঠানো তার নিষ্কলুষ ভালোবাসা ছাড়া আর কিছুই নয়। এটা আমার সৌভাগ্য যে, আল্লামা
ইকবালের বদৌলতে একজন প্রবীণ ব্যক্তির ভালোবাসা ও দোয়ার যোগ্য পাত্রে পরিণত
হয়েছি।
'আল্লামা ইকবাল ও তারানায়ে হিন্দি' সম্পর্কে এ অধমের কলাম নিয়ে বহু ছাত্র আমাকে নানা
প্রশ্ন করেছেন। প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি, সবার প্রশ্নের আলাদা আলাদা উত্তর দিতে আমি
অপারগ। এর পরের নিবেদন হচ্ছে, আমি কোনো বুদ্ধিজীবী বা ইকবাল-বিশেষজ্ঞ নই।
একজন সাধারণ সাংবাদিক। সীমিত সামর্থ্যানুযায়ী আল্লামা ইকবালের চিন্তা ও দর্শনের
গভীরতায় অবরোহণের চেষ্টা করছি মাত্র। কিছু দিন আগে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের
মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি 'তারানায়ে হিন্দি' সম্মাননা পুরস্কার ঘোষণা করলে আমি 'তারানায়ে
হিন্দি'র (ভারতীয় সঙ্গীত) পাশাপাশি আল্লামা ইকবালের 'তারানায়ে মিল্লি'র (জাতীয় সঙ্গীত)
আলোচনা করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলাম। কয়েক দিন আগে জিও নিউজে এমকিউএম
নেতা আলতাফ হোসাইনের সাথে পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল।
যখন আমি জানতে চাইলাম, কিছু দিন আগে পর্যন্ত আপনি আর্মি অফিসারদের বিপ্লব ঘটানোর
পরামর্শ দিয়েছেন, কেন? তিনি জবাবে বললেন, আল্লামা ইকবালও তো এ কবিতা রচনা
করেছিলেন-
সারে জাহাঁ সে আচ্ছা হিন্দুসিতাঁ হামারা/
হাম বুলবুলে হেঁ ইস কি, ইয়ে গুলসিতাঁ হামারা*
সারা বিশ্বের চেয়ে সেরা হিন্দুস্তান আমাদের/
আমরা বুলবুল এখানকার, এত পুষ্পোদ্যান আমাদের।
আলতাফ হোসাইনের ওই জবাবে আমি বললাম, আল্লামা ইকবাল এ কবিতা অবশ্যই
লিখেছেন, তবে পরবর্তী সময়ে তার চিন্তাদর্শনে পরিবর্তন আসে। তিনি নতুন কবিতা রচনা
করেছিলেন। আলতাফ হোসাইন আমার সাথে একমত হননি। আমাদের আলোচনার বিষয়
ছিল, এমকিউএমের পার্লামেন্ট থেকে পদত্যাগ। আমি 'তারানায়ে হিন্দি'র জবাবে 'তারানায়ে
মিল্লি' কবিতা পড়া থেকে বিরত থাকলাম। কেননা এমন পরিস্থিতিতে তিক্ততা সৃষ্টি হওয়ার
শঙ্কা ছিল। জিও নিউজে আমার সাথে তার লাইভ আলোচনা শেষ হতেই আমি দর্শকদের
বললাম, আল্লামা ইকবাল 'তারানায়ে হিন্দি' ১৯০৪ সালে রচনা করেছিলেন। এরপর তিনি
উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ চলে যান। বিদেশ থেকে ফিরে এসে তিনি ১৯১০ সালে 'তারানায়ে
মিল্লি' রচনা করেন। যে কবিতা তার দর্শনের মাঝে পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছিল। তিনি
লিখলেন-
চীন ও আরাব হামারা, হিন্দুস্তাঁ হামারা/মুসলিম হেঁ হাম, ওয়াতান হ্যায় সারা জাহাঁ
হামারা/তাওহিদ কি আমানাত সিনুঁ মেঁ হ্যায় হামারা/আসাঁ নেহি মিটানা নাম ও নিশাঁ হামারা।
চীন ও আরব আমাদের, হিন্দুস্তান আমাদের/মুসলিম যে মোরা, সারা পৃথিবীটাই নিজভূমি
আমাদের/তৌহিদের আমানত রয়েছে সিনাতে মোদের/ মিটানো সহজ নয় নাম-নিশানা
মোদের।
মোট কথা আল্লামা ইকবাল 'তারানায়ে হিন্দি'ও রচনা করেছেন, 'তারানায়ে মিল্লি'ও রচনা
করেছেন। 'তারানায়ে হিন্দি' থেকে 'তারানায়ে মিল্লি'র দিকে পরিভ্রমণ মূলত অখণ্ড ভারত
থেকে পাকিস্তানের দিকে পরিভ্রমণ। একসময় আল্লামা ইকবাল ও কায়েদে আযম উভয়ে
কংগ্রেসের সাথে থেকে ইংরেজদের গোলামি থেকে মুক্তির জন্য আন্দোলনে বিশ্বাসী ছিলেন।
কিন্তু উভয়ে যখন অনুভব করলেন, কংগ্রেস সেকুলারিজমের নামে ব্রাহ্মণ্যবাদের ইজারাদারি
কায়েম করতে চাচ্ছে, তখন এ দুজন নেতা কংগ্রেস থেকে ফিরে আসেন। তারা মুসলমানদের
জন্য পৃথক ভূমির ব্যাপারে ভাবতে শুরু করেন। এ বিষয়টি বেশ মজাদার যে, আল্লামা
ইকবালের 'তারানায়ে মিল্লি' সর্বপ্রথম একজন অমুসলিম বুদ্ধিজীবী ড. অমিয় চক্রবর্তী ১৯১২
সালে উর্দু থেকে বাংলায় অনুবাদ করেন এবং এ অনুবাদ কলকাতার মাসিক আল এছলাম-এ
প্রকাশ করা হয়। ড. চক্রবর্তীর কথা আমি 'আল্লামা ইকবাল ও তারানায়ে হিন্দি' কলামেও
উল্লেখ করেছি। আমেরিকার বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নাদিম আহমদ ইমেইলে জানতে
চেয়েছেন, ড. অমিয় চক্রবর্তী কে? চক্রবর্তী বাংলা ভাষার কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেক্রেটারি
ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হন। তিনি আল্লামা ইকবালের
ভক্ত ছিলেন। ড. চক্রবর্তীর মাধ্যমে ঠাকুরের এ বক্তব্য মানুষের কাছে পৌঁছেছে- 'ড. ইকবাল
এবং আমি সততা ও সৌন্দর্যের নিমিত্তে সাহিত্যচর্চারত দুই বন্ধু এবং এমন এক জায়গায়
এসে এক হয়ে যাই, যেখানে মানবিক চিন্তা তার সর্বোত্তম উপহার শাশ্বত মানবতার সামনে
অর্পণ করে।'
ড. চক্রবর্তীর পরে কলকাতার বাংলা পত্রিকা সোলতান-এর সম্পাদক আশরাফ আলী খান
আল্লামা ইকবালের কাব্যগ্রন্থ শেকওয়াহ-এর অনুবাদ করেন। মাওলানা মোহাম্মদ আকরম
খাঁর বাংলা পত্রিকা মোহাম্মদীতে শেকওয়াহ ও জওয়াবে শেকওয়াহর বাংলা অনুবাদ প্রকাশ
হয়। ওই অনুবাদগুলো মূল কাব্যের সাথে মিলিয়ে পড়ার পর বাংলা ভাষার বড় কবি কাজী
নজরুল ইসলাম মুহাম্মদ সুলতানের নামে এক পত্রে লিখেছিলেন, "শেকওয়াহ ও জওয়াবে
শেকওয়াহ মহাকবি আল্লামা ইকবালের অনন্য সৃষ্টি।"
বাংলাদেশের বিখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফাকে ইকবালপ্রেমিক মনে করা হয়। তিনি ইকবালের
রচনার অনুবাদও করেছেন এবং ইকবালের প্রশংসায় কয়েকটি কবিতাও রচনা করেছেন।
ইকবালের রচনায় কাশ্মিরের আলোচনা পড়ে কবি গোলাম মোস্তফা কাশ্মিরের স্বাধীনতা
আন্দোলনের পক্ষেও কবিতা রচনা করেছেন। এ বাস্তবতা উপেক্ষা করা যাবে না যে, ঠাকুর ও
কাজী নজরুল ইসলামের মতো বড় কবিরা 'তারানায়ে হিন্দি'ও পড়েছেন, 'তারানায়ে মিল্লি'ও
পড়েছেন। আল্লামা ইকবালের চিন্তাদর্শনে পরিবর্তন সত্ত্বেও তারা ইকবালের কাব্যধারার ভূয়সী
প্রশংসা করেছেন।
অপর দিকে, আল্লামা ইকবালের বিনয়ের জগৎটা এমন ছিল যে, তিনি নিজেকে অধ্যবসায়হীন
এবং ঠাকুরকে একজন অধ্যবসায়ী ব্যক্তি হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। পাকিস্তানের জাতীয়
কবি এবং ভারত ও বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত রচয়িতাদ্বয়ের মাঝে শ্রদ্ধার এ সম্পর্ক এ
অঞ্চলের চিন্তাবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের অনেক কিছু ভেবে দেখার আহ্বান করছে।"

* নোট : প্রিয় পাঠক, 'হিন্দুস্তাঁ' ও 'গুলিস্তাঁ' হচ্ছে আভিধানিক উচ্চারণ। আমরা এর আগে
'আল্লামা ইকবাল ও তারানায়ে হিন্দি' কলামটিতে এ উচ্চারণই ব্যবহার করেছিলাম। কিন্তু
'তারানায়ে হিন্দি'তে ছন্দধারা রক্ষার্থে এর সঠিক উচ্চারণ হবে 'হিন্দুসিতাঁ' ও 'গুলসিতাঁ'।
আল্লামা ইকবাল এ উচ্চারণেই এটি রচনা করেছেন। গানটি শুরু থেকে অদ্যাবধি এই
উচ্চারণেই গাওয়া হচ্ছে। জনাব আর ডি কুরায়শী জানান, তিনি সেই শুরু থেকেই 'হিন্দুসিতাঁ'
ও 'গুলসিতাঁ' উচ্চারণেই শুনে আসছেন। এর আগের কলামে 'হিন্দুস্তাঁ' ও 'গুলিস্তাঁ' লেখার জন্য
আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত। পাশাপাশি দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য আর ডি কুরায়শীকে অসংখ্য
ধন্যবাদ জানাই- অনুবাদক।
লেখক : পাকিস্তানের জিও টিভির নির্বাহী সম্পাদক
পাকিস্তানের জাতীয় পত্রিকা দৈনিক জং ২০ আগস্ট, ২০১৫ হতে উর্দু থেকে ভাষান্তর
ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...

Welcome

Website counter

Followers

Blog Archive